রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা নিরসনে এবার নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে যানজট শুল্ক বা কনজেশন চার্জ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু সড়কে যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি ৬ দশমিক ২৭ টাকা হারে শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এ শুল্ক ঢাকার সব সড়কে কার্যকর হবে না। এটি শুধু সেসব করিডোরে প্রযোজ্য হতে পারে, যেখানে মেট্রোরেল, বিআরটি বা উন্নতমানের গণপরিবহন সেবা থাকবে।
প্রস্তাবিত এ শুল্ক মূলত প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও ট্রাকের ক্ষেত্রে আরোপের কথা বলা হয়েছে। বৃহত্তর ঢাকার জন্য ২০২৫ থেকে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছর মেয়াদি হালনাগাদকৃত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় এ সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যানজট শুল্ক কার্যকর করার আগে অবশ্যই বিকল্প হিসেবে নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

কোন সড়কে কার্যকর হতে পারে এ শুল্ক
বর্তমানে ঢাকায় যানজট শুল্ক আরোপের উপযোগী প্রধান করিডোর হিসেবে উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল রুটকে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ এ পথে ইতোমধ্যে একটি কার্যকর গণপরিবহন বিকল্প তৈরি হয়েছে। এর বাইরে ঢাকায় আরো কয়েকটি মেট্রোরেল প্রকল্প চলমান ও পরিকল্পনাধীন রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতেও যানজট শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এছাড়া বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি করিডোর বাস্তবায়িত হলে সেটিও যানজট শুল্কের আওতায় আসতে পারে। একইভাবে সরকার যদি কোম্পানিভিত্তিক উন্নত বাস পরিষেবা চালু করতে পারে, তাহলে যেসব রুটে এ ধরনের বাস সেবা থাকবে, সেসব রুটেও প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও ট্রাক থেকে শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনা থাকতে পারে। অর্থাৎ লক্ষ্য হলো যেখানে গণপরিবহন থাকবে, সেখানে ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ কমানো।
কেন প্রয়োজন হচ্ছে যানজট শুল্ক
ঢাকার সড়কে যানবাহনের গতি গত দেড় দশকে আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। একসময় যে সড়কে যানবাহন ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলতে পারত, বর্তমানে অনেক ব্যস্ত সড়কে সেই গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারের কাছাকাছি নেমে এসেছে। এতে প্রতিদিন মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, জ্বালানি অপচয় হচ্ছে এবং অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
যানজট এখন শুধু সড়কের সমস্যা নয়; এটি শহরের জীবনমান, ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও উৎপাদনশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অফিসগামী মানুষ দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকছেন, পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে, জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে ঢাকার কার্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে যানজট নিয়ন্ত্রণে শুধু সড়ক বাড়ানো নয়, সড়কের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের দিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
সম্ভাব্য খরচের হিসাব
প্রস্তাবিত হারে প্রতি কিলোমিটারে ৬.২৭ টাকা শুল্ক ধরা হয়েছে। সেই অনুযায়ী দূরত্বের ভিত্তিতে খরচের হিসাবটি নিম্নরূপ:
দূরত্ব অনুযায়ী দৈনিক খরচ:
- ৫ কিলোমিটার: প্রায় ৩১ টাকা
- ১০ কিলোমিটার: প্রায় ৬৩ টাকা
- ১৫ কিলোমিটার: প্রায় ৯৪ টাকা
- ২০ কিলোমিটার: প্রায় ১২৫ টাকা
(দ্রষ্টব্য: শুল্কযুক্ত সড়কে যাতায়াতের দূরত্ব যত বাড়বে, খরচও আনুপাতিক হারে তত বাড়বে।)
বিভিন্ন যানবাহনের জন্য মাসিক সম্ভাব্য প্রভাব:
- প্রাইভেট কার: দৈনিক ২০ কিমি যাতায়াতে মাসিক খরচ দাঁড়াবে প্রায় ২,৭৫০ টাকা (২২ কর্মদিবস)। দৈনিক ৩০ কিমি যাতায়াতে এই খরচ ৪,১০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
- মোটরসাইকেল: প্রতিদিন ১০ কিমি যাতায়াতে মাসিক খরচ পড়বে প্রায় ১,৩৮০ টাকা।
- ট্রাক: প্রতিদিন ২৫ কিমি যাতায়াতে মাসিক খরচ (২৬ দিন) দাঁড়াতে পারে ৪,০০০ টাকার বেশি।
এই হিসাবগুলো স্পষ্ট করে যে, যানজট শুল্ক কার্যকর হলে নিয়মিত যাতায়াতকারী, মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী এবং পণ্য পরিবহন খাতের ওপর আর্থিক প্রভাব পড়বে, যা বাস্তবায়নের আগে বিশদ বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
কীভাবে আদায় হতে পারে শুল্ক
প্রস্তাবনায় যানজট শুল্ক আদায়ে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। নির্দিষ্ট সড়কে আরএফআইডি রিডার স্থাপনের মাধ্যমে যানবাহন শনাক্ত করা হতে পারে। প্রতিটি যানবাহনের সঙ্গে ডিজিটাল পরিচিতি বা ট্রান্সপন্ডার যুক্ত থাকলে সড়কে প্রবেশ বা নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রমের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুল্ক কেটে নেয়া সম্ভব হবে।
এ ব্যবস্থার জন্য একটি নির্ভুল যানবাহন ডেটাবেজ, নিবন্ধিত যানবাহনের তথ্য, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ট্রাফিক মনিটরিং সিস্টেম প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ এবং ট্রাফিক বিভাগকে সমন্বিতভাবে এ ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, তথ্য নিরাপত্তা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির সুযোগও নিশ্চিত করা জরুরি।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন কৌশল
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, যানজট শুল্ক শুধু টাকা আদায়ের ব্যবস্থা নয়; এটি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার একটি আধুনিক কৌশল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যস্ত সময়ে সড়কে গাড়ির চাপ কমাতে এ ধরনের শুল্ক ব্যবহার করা হয়। এতে অনেক চালক পিক আওয়ার এড়িয়ে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা সময়ে যাত্রা করতে উৎসাহিত হন।
এ ক্ষেত্রে সময়ভেদে শুল্কের হার ভিন্ন করা যেতে পারে। যেমন ভোর বা রাতের ফাঁকা সময়ে শুল্ক কম রাখা, আর অফিস সময়ের মতো অতিরিক্ত ব্যস্ত সময়ে শুল্ক বেশি রাখা। এতে একই সময়ে সড়কে গাড়ির চাপ কমে বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে যেতে পারে। এ ধরনের ভেরিয়েবল শুল্ক পদ্ধতি ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে কার্যকর হতে পারে, যদি তা সঠিক পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা যায়।
গণপরিবহন আগে, শুল্ক পরে
যানজট শুল্ক বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন। মানুষ যদি ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেলের পরিবর্তে মেট্রোরেল, বিআরটি বা উন্নত বাস সেবা ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে এ শুল্ক সাধারণ মানুষের কাছে বাড়তি চাপ হিসেবে দেখা দেবে। তাই শুল্ক কার্যকরের আগে গণপরিবহনকে সময়নিষ্ঠ, নিরাপদ, আরামদায়ক ও সহজলভ্য করতে হবে।
বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও কর্মজীবী মানুষের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কারে শুল্ক আরোপ করলে সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। তাই নীতিটি ধাপে ধাপে, নির্দিষ্ট করিডোরে এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির পর বাস্তবায়ন করা উচিত।
শুল্কের অর্থ কোথায় ব্যয় হবে
পরিকল্পনায় যানজট শুল্ককে শুধু যানজট কমানোর উপায় হিসেবে নয়, পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের নতুন অর্থায়ন উৎস হিসেবেও বিবেচনা করা হয়েছে। তবে এ অর্থ কোথায় ব্যয় হবে, তা জনসাধারণের কাছে পরিষ্কার করা জরুরি। শুল্ক থেকে পাওয়া অর্থ যদি গণপরিবহন উন্নয়ন, ফুটপাত সংস্কার, সিগন্যাল আধুনিকায়ন, বাস ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তায় ব্যবহার করা হয়, তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে।
কিন্তু যদি এটি কেবল নতুন ফি হিসেবে দেখা যায়, তাহলে পরিকল্পনাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই এ উদ্যোগের সফলতার জন্য দরকার স্বচ্ছ হিসাব, জনপরামর্শ, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন কৌশল।
বাস্তবায়নে সতর্কতার প্রয়োজন
ঢাকার যানজট কমাতে যানজট শুল্ক একটি আধুনিক ও সম্ভাবনাময় ধারণা হতে পারে। তবে এটি কোনো একক সমাধান নয়। এর সঙ্গে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, বাস রুট ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিক করা এবং গণপরিবহনকে শক্তিশালী করার কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, যানজট শুল্ক পরিকল্পনা ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এ পরিবর্তন সফল করতে হলে আগে মানুষের জন্য কার্যকর বিকল্প তৈরি করতে হবে। গণপরিবহন শক্তিশালী না করে শুল্ক আরোপ করলে তা ভোগান্তি বাড়াতে পারে। আর সঠিক প্রস্তুতি, স্বচ্ছতা ও জনবান্ধব বাস্তবায়ন থাকলে এটি ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


